Ziaur Rahman Bokul
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কারিগরি শিক্ষা সেলাই মেশিনে বদলে যাচ্ছে জীবন

কারিগরি শিক্ষা সেলাই মেশিনে বদলে যাচ্ছে জীবন

স্টাফ রিপোর্টার ঠাকুরগাঁও: কারিগরি শিক্ষা সেলাই মেশিনে বদলে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের আদিবাসী নারীদের। একটা সময় সংসারের চাকা ঘোরাতে  আদাবাসী নারীদের প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতো। এখন কারিগরি শিক্ষা নিয়ে বদলে যেতে শুরু করেছে জীবনজীবিকা। তেমনি একজন  সীমা মিনজি। 

কখনো ধানের জমিতে, কখনো ফসলের মাঠে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দিনভর অন্যের জমিতে কাজ করতেন তিনি। দিন শেষে পাওয়া মজুরিই ছিল পাঁচ সদস্যের সংসারের ভরসা। কোনো দিন কাজে যেতে না পারলে কখনো কখনো চুলোয় হাঁড়ি ওঠাও কঠিন হয়ে পড়ত।
সেই সীমার জীবন এখন বদলে গেছে। আর অন্যের জমিতে কাজের জন্য ছুটতে হয় না তাঁকে। নিজের ঘরেই তৈরি হয়েছে কর্মস্থল। সামনে সেলাই মেশিন, পাশে কাপড়ের স্তূপ। মাপ নেওয়া, কাপড় কাটা, সেলাই করা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি সবই করেন নিজ হাতে। এই কাজ করে এখন মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন তিনি। 
কোনো কোনো মাসে আয় আরও বেশি হয়। একসময় যে হাত অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখত, সেই হাতই এখন নিজের দক্ষতায় সংসারের ভবিষ্যৎ গড়ছে। সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের একটি আদিবাসী গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সীমা মিনজির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তাঁর নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর সহায়তায় রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ।
সীমার বিয়ে হয় ২০২১ সালে ঐ এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল ওরাওয়ের সঙ্গে। পেশায় বিদ্যুৎ মেকানিক উজ্জ্বলের সঙ্গে সংসারে আছেন তাঁদের এক সন্তান এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি। সব মিলিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার। বিয়ের পর সংসারে এসে সীমা বুঝতে পারেন, শুধু স্বামীর আয় দিয়ে পরিবারের সব খরচ চালানো সহজ নয়। পরিবারের সদস্য বেশি, কিন্তু আয় সীমিত। তাই সংসারের পাশে দাঁড়াতে তিনিও কাজে নামেন। মাঠের কাজই ছিল তাঁর প্রধান ভরসা। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা যে কাজ মিলত, সেটিই করতেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যের জমিতে কাজ করে পাওয়া মজুরি তুলে দিতেন সংসারে।

জীবনের সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একদিন নতুন একটি সুযোগের কথা জানতে পারেন সীমা। একটি কমিউনিটি আউটরিচ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, কায়িক শ্রমের পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে নিজের আয় করার সুযোগ রয়েছে। সংগঠনটির সহায়তায় যুক্ত হওয়ার পর সেই সুযোগ আসে তাঁর সামনে। 
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Apprenticeship বা গুরু-শিষ্য পদ্ধতি। এতে শুধু শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, একজন অভিজ্ঞ কারিগরের তত্ত্বাবধানে বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পান প্রশিক্ষণার্থীরা। সীমা নিজের আগ্রহ অনুযায়ী বেছে নেন ‘ফ্যাশন গার্মেন্টস ড্রেস মেকিং অ্যান্ড টেইলারিং’ ট্রেড। ছয় মাসের প্রশিক্ষণে তাঁর প্রশিক্ষক ছিলেন মোছা. হাসনা বানু ময়না। প্রশিক্ষণের শুরুতে সেলাইয়ের অনেক কাজই সীমার কাছে নতুন ছিল। প্রশিক্ষণ শেষে সীমা আর আগের জীবনে ফিরে যাননি।  সংগঠন থেকে ঋণ সহায়তায় নিজেই সেলাই মেশিন কিনেন। সীমার এই পরিবর্তন শুধু পরিবারের মানুষই দেখেননি, দেখেছেন প্রতিবেশীরাও।
স্থানীয়রা জানান, আমাদের মতো আদিবাসী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঘরের কাজ সামলে বাইরে গিয়ে নিয়মিত কাজ করা কঠিন। সীমা সেলাইয়ের কাজ শিখে ঘরে বসে আয় করার একটা পথ তৈরি করেছেন। এতে সংসারও সামলাতে পারছেন, আবার নিজের আয়ও হচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে অন্যরাও উৎসাহ পাচ্ছেন।
সীমার পরিবর্তনে সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে গর্বিত তাঁর স্বামী উজ্জ্বল ওরাও। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই দেখেছি, সংসারে অভাব ছিল। আমার একার আয়ে সবকিছু সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত। সীমাও তখন মাঠে কাজ করতে যেত। অনেক সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরত। শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলেও সংসারের জন্য পরদিন আবার কাজে যেতে হতো। একদিন কাজ না হলে সংসারে তার প্রভাব পড়ত। সীমার সব সময়ই নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কী করবেন, কোথা থেকে শুরু করবেন তা বুঝতে পারতেন না। রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার পর তাঁর মধ্যে পরিবর্তন আসে। সেলাইয়ের কাজ শেখার প্রতি ওর খুব আগ্রহ ছিল। প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে এসে বাড়িতেও নিয়মিত অনুশীলন করত। ধীরে ধীরে কাজটা ভালোভাবে শিখে নেয়।

সীমা মিনজি জানান, একদিন কমিউনিটি আউটরিচের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারি, প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের কাজ করা যায়। তখন মনে হলো, আমি যদি একটা কাজ ভালোভাবে শিখতে পারি, তাহলে হয়তো আর প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে হবে না। সেই ইচ্ছা থেকেই রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে ভর্তি হই। সংগঠনটি আমাকে এই সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে। ৬ মাসের প্রশিক্ষণে অনেক কিছু শিখেছি। শুরুতে সেলাইয়ের কাজ কঠিন মনে হলেও পরে ধীরে ধীরে সব শিখে ফেলি। এখন নিজের হাতে কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারি। এই আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি, সন্তানের জন্য খরচ করতে পারছি। আগের জীবনের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখলে নিজের মধ্যেই যেন নতুন এক সীমাকে দেখতে পান তিনি। সুযোগ পেলে অন্য মেয়েদেরও সেলাই শেখাতে চাই। 

সংগঠানটির কোঅর্ডিনেটর সামসুত তাবরিজ বলেন, সীমা মিনজির মতো নারীদের জন্য কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই রেইজ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা যেন সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন, সেদিকেও আমরা গুরুত্ব দিই। সীমা প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাইয়ের কাজ শুরু করে এখন নিজের সংসারে অবদান রাখছেন এটি আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীরা যদি ঘরে বসে আয় করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমরা চাই, সীমার মতো আরও নারীরা প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠুন সকল নারীরা।




মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এবার হত্যার হুমকি পেল হান্নান মাসউদ, থানায় জিডি

1

নদীতে খেলতে গিয়ে পাঁচ শিশু নিখোঁজ, চারজনের লাশ উদ্ধার

2

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার মরদেহ, লাখো মানুষের ঢল

3

বেলা ১১টায় বসবে হাসিনার মামলার রায়ের ট্রাইব্যুনাল

4

বিএনপির স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক আজ ; ভারমুক্ত’ হতে পারেন তা

5

মনোনয়ন হারালেন আরো ১৭ প্রার্থী

6

নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি প্রধান

7

আপনাদের ভালোবাসা আমাদের শক্তি জুগিয়েছে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আগাম

8

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত; দ্বিরাষ্ট্র গঠনই সমাধানের একমাত্র পথ

9

রাবির ৩ শিক্ষক বরখাস্ত, দণ্ডিত ৫ শিক্ষার্থী

10

ভূমিকম্পে ঢাকায় নিহত ৩

11

ঠাকুরগাঁওয়ে তিন ফার্মেসি মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত কমিট

12

ফরিদপুরে ‘ঢাকা লকডাউন’ সমর্থনে সড়ক অবরোধ

13

ভরিতে সাড়ে ৫ হাজার কমল স্বর্ণের দাম, রবিবার থেকে কার্যকর

14

লোকায়ন জাদুঘরের সংগ্রহে মুগ্ধ, ইকো ইউনিভার্সিটি নিয়ে আশাবাদ

15

ষড়যন্ত্র হলেও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা নেই: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

16

দেশের বাজারে আবারো কমল স্বর্ণের দাম

17

জুলাইকে নিরাপদ রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব: আসিফ নজরুল

18

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

19

গুলি করে হত্যার ৭ দিন পর লাশ ফেরত দিলো বিএসএফ

20
সর্বশেষ সব খবর