Ziaur Rahman Bokul
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫, ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আজও ফ্যাসিস্ট দোসরদের হাতেই কিশোরগঞ্জ

আজও ফ্যাসিস্ট দোসরদের হাতেই কিশোরগঞ্জ

হারিছ আহমেদ, কিশোরগঞ্জ

১৭ বছর ধরে যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার গুণগানে লিপ্ত ছিলেন, এখনও সেসব কর্মকর্তাই পরিচালনা করছেন কিশোরগঞ্জ জেলা।

পতিত সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের অপতৎপরতা সাধারণ জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব কর্মকর্তার দ্বারা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না- এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভোটাররা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ফৌজিয়া খান। তিনি ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জে ডিসি হিসেবে যোগদান করেন। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ফৌজিয়া খান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব হিসেবে তিন বছর ৫ মাস ৮ দিন দায়িত্ব পালন করে স্বৈরাচার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পতিত হাসিনা সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি ইটভাটা চালুর সময় ৯০ হাজার টাকা এলআর ফান্ডে নেওয়া হয়, অর্থের বিনিময়ে বালুমহাল ইজারা প্রদান, ২০২৪ সালে দুর্গাপূজায় ১০০ টন চাল আত্মসাৎ, জমি অধিগ্রহণের টাকা থেকে ৭ শতাংশ তার এল-আর ফান্ডে নেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এই ডিসির বিরুদ্ধে।

জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বেও রয়েছেন ফৌজিয়া খান। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন (উপসচিব) মোছা. মোস্তারী কাদেরী। তিনি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদে যোগদান করেন। বর্তমান সরকারের আমলে ডিসিরা জেলা পরিষদের দায়িত্ব পাওয়ার পর নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে গেলেও তাদের আনন্দ ভ্রমণসহ অফিস ডেকোরেশনের কাজ থেমে থাকেনি। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মোস্তারী কাদেরী বলেন, নিজেদের টাকায় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের এলাকা মিঠামইন উপজেলার ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন খান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। সেসময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তার নির্দেশে পুলিশ গুলি ছুড়লে বহু ছাত্র-জনতা আহত হয়। যারা এখনও গুলির ক্ষত নিয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ধাওয়া খেয়ে ইউএনও খান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাসভবনে ফেলে পালিয়ে যান। পরে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা তার মা-বাবাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে বাসায় অগ্নিসংযোগ করে। পরে ঢাকার জেলা প্রশাসক তার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি ও তদন্ত কমিটি গঠন করেন। যদিও তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশ পায়নি। অথচ সেই খান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন কোনো শাস্তি পাবেন তো দূরের কথা, এ সরকারের আমলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মিঠামইনে রাজত্ব করছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে মুজিব আলম ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে কিশোরগঞ্জে যোগদান করেন। তিনি পতিত সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। তা ছাড়া তিনি এখানে যোগদানের পর শেখ রাসেল স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টসহ জেলা প্রশাসনের সহায়তায় শেখ পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নানা ক্রীড়া ও খেলাধুলার আয়োজন করেন। তিনি এখনও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মো. কামরুজ্জামান ২০১৮ সালের ২১ মার্চ কিশোরগঞ্জে যোগদান করেন। তিনিও পতিত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তার অধীনস্ত সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. আলামিন (বর্তমানে তাড়াইলে কর্মরত) প্রতিবন্ধী ভাতার প্রায় ৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ধরা পড়লেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া জেলায় অন্তত ২৫ কর্মকর্তা স্বৈরশাসক হাসিনার দোসর হয়েও দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন।

ডিডি কামরুজ্জামানসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সাবেক সরকারের নির্দেশনা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে পালন করেছি। তবে জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্য পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল সালাম বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনে সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারাই রয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, স্বচ্ছ নির্বাচন করতে হলে এখনও সময় আছে, যেসব কর্মকর্তার সহযোগিতায় শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হয়েছিল, তাদেরকে নির্বাচনসহ যাবতীয় দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে।

বিএনপির সহসভাপতি বরকতউল্লা বুলু বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লব সফল হয় এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে উৎখাত করা হয়। কিন্তু ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও ফ্যাসিস্টের অনেক দোসর রং পাল্টিয়ে সরকারের নানা জায়গায় রয়ে গেছেন। এদের দমন করা না গেলে আসন্ন নির্বাচনসহ সরকারের সব উদ্যোগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে বর্তমান জেলা প্রশাসকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। এমনকি ফোনও রিসিভ করেন না। যা জেলাবাসীর জন্য দুর্ভাগ্যজনক। এমন ডিসি এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, বিগত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের প্রশাসনে রেখে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না- এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। আশা করি, সরকার ও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

সকালবেলা/এমএইচ

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতের মনোনয়ন পেলেন ড. ফয়জুল হক

1

খালেদা জিয়ার শেষ যাত্রায় লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা

2

সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

3

জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী

4

আইনি বাধার মুখে ৩ শহর থেকে ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহার

5

এইচএসসির খাতা চ্যালেঞ্জের ফল ১৬ নভেম্বর

6

নাশকতার অভিযোগে দিনাজপুরে ৫৯ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ ৮৬ জন গ

7

তরুণদের মতামত নিতে ওয়েব অ্যাপ চালু করল বিএনপি

8

নগদের সাবেক এমডি তানভীরসহ স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ৭৪ ব্যাংক হিসা

9

কিশোরগঞ্জে সাবেক চেয়ারম্যানকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

10

শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করলেন পীর সাহেব চরমোনাই

11

দলীয় লোক অপসারণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি বিএনপির

12

রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে কী খাবেন ?

13

তফসিল রেকর্ডের জন্য বিটিভি-বেতারকে ইসির চিঠি

14

তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

15

মৃত্যুর সংবাদ গুজব, ইমরান খান বেঁচে আছেন: কারা কর্তৃপক্ষ

16

মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল

17

আজ জকসু নির্বাচন, কড়া নজরদারিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রবেশ

18

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনের

19

রাষ্ট্রীয় শোকের শেষ দিন আজ, বাদ জুমা মসজিদে মসজিদে দোয়া

20
সর্বশেষ সব খবর