ফুটবল

বাবাকে হারিয়ে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন বাদ দিয়েছিলেন বাবলু

নিউজ ডেস্ক: দিনাজপুর সদর উপজেলার পশুরামপুর গ্রামের সিলভেস্টার মুরগি আর মাছের খামারের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। সিলভেস্টার ও এলিজাবেথ দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসারটা ভালই চলছিল। তাদের বড় ছেলে ম্যাথিউস বাবলুর লেখাপড়ার পাশাপাশি ফুটবলেও নেশা ছিল। যে নেশা তাকে নিয়ে এসেছে দেশের সর্বোচ্চ লিগ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে। এ বছর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে নবাগত দল ছিল পুলিশ ফুটবল ক্লাব। ঐ ক্লাবের ফরোয়ার্ড বাবলু ভুলে যাওয়া স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন আবার।

নিজেদের জমিজমা নেই। বাড়ির পাশেই অন্যের জমি আর পুকুর ভাড়া নিয়ে সেখানে মুরগি ও মাছের খামার করে সংসার চালাতেন বাবলুর বাবা সিলভেস্টার। কিন্তু ২০১৩ সালে খামারে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হয়ে মারা যান সিলভেস্টার। বড় ছেলে হিসেবে চোখেমুখে তখন অন্ধকার বাবলুর। একদিন জাতীয় দলে খেলবেন- ফুটবল নিয়ে যে স্বপ্ন লালনপালন করছিলেন, তা ফিকে হতে থাকে বাবার হঠাৎ চিরবিদায়ে।

কিন্তু হাল ছাড়েননি বাবলু। সংসারের ভার কাঁধে নিয়েও ফুটবল খেলে যান। বিভিন্ন জায়গায় ট্রায়াল দেন। সিলেট একাডেমিতে ওঠানোর জন্য অনূর্ধ্ব-১৮ যে ফুটবলারদের বাছাই করেছিল বাফুফে সেখানে টিকেছিলেন বাবলু। কিন্তু ঐ একাডেমিতে আর সামনে আগায়নি। পরে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের একাডেমিতে যোগ দিয়ে অনুশীলন শুরু করেন।

কোটি টাকার সুপার কাপ খেলার জন্য শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব তাদের একাডেমি থেকে কয়েকজন খেলোয়াড় নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন বাবলু। শেখ জামালের একাডেমি বন্ধ হয়ে গেলে ২০১৪-১৫ সালে প্রথমে বিজেএমসির অনূর্ধ্ব-১৮ দলে এবং পরে টানা দুই মৌসুম দলটির জার্সিতে খেলেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। পরের মৌসুমের জন্যও দলটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে পুলিশে কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়ে বিজেএমসি ছেড়ে চলে যান বাবলু।

‘ঐসময় আমার স্থায়ী চাকরিটা ছিল বেশি জরুরি। তাই প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ছেড়ে যোগদান করি পুলিশে। বাবা মারা যাওয়ার পর জাতীয় দলের খেলার ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নটা দেখা বাদ দিয়েছিলাম পুলিশে যোগ দিয়ে। কিন্তু পুলিশ দলের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ খেলে এবং দলকে চ্যাম্পিয়ন করে প্রিমিয়ার উঠিয়ে আবার যখন শীর্ষ লিগে খেলা শুরু করলাম তখন ফুটবলে যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখার পরিবেশ পেলাম। ফুটবলে মনোনিবেশ বাড়িয়ে দিলাম। এখন আমি আগের চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করছি জাতীয় দল নিয়ে। লাল-সবুজ জার্সি গায়ে দেয়ার স্বপ্নপূরণে যত কষ্ট করতে হয় করব’- বলছিলেন দিনাজপুরের ২১ বছরের এ যুবক।

পুলিশে চাকরি করে ছোট বোন ও ভাইকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। বোন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে নার্সিংয়ে ট্রেনিং নিচ্ছেন। ছোট ভাই এ বছর মাধ্যমিক পাস করেছেন। বাবলু ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনন্টিটিউট থেকে চার বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। চাকরি আর ফুটবল খেলে সংসারের হালটা ভালো করেই ধরেছেন ৭ বছর আগে বাবাকে হারানো এ ফুটবলার। এখন একটাই তার স্বপ্ন জাতীয় ফুটবল দলে খেলা। যে স্বপ্নটা দেখা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন।

শীর্ষ লিগে এসে ৫ ম্যাচ খেলে দুটি গোল করেছেন বাবলু। দুটি গোলই ছিল দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বসুন্ধরা কিংস ও ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে পিছিয়ে থাকার পর ১-১ এ ড্র করায় বড় ভূমিকা ছিল এই বাবলুর। বসুন্ধরা কিংসের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়া পুলিশ সমতায় ফিরেছিল বাবলুর কৃতিত্বেই। ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে ম্যাচেও পিছিয়ে পড়া পুলিশকে এক পয়েন্ট এনে দিয়েছিলেন বাবলু গোল করে।

কখনও জাতীয় দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে ডাক পাননি তিনি। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের জন্য সহসাই ক্যাম্পের প্রাথমিক দল ঘোষণা করবেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ জেমি ডে। যদি ডাক পান তাহলে মূল স্কোয়াডে টিকে থাকার চেষ্টা করবেন বলে দিনাজপুর থেকে বলছিলেন এ ফরোয়ার্ড, ‘যদি কোচের নজরে আসি এবং ডাক পাই তাহলে আমার লক্ষ্যই থাকবে স্কোয়াডে টিকে থাকা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *