রবিবার, অক্টোবর ২৪

ট্রেন যাত্রায় বিরক্তি কবে মিলবে স্বস্তি -আজমত রানা

একতা এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা আছে। ট্রেন ছাড়ার কথা সকাল ১০টায়। আগেভাগেই কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে হাজির হলাম। কোন প্ল্যাটফরমে ট্রেন দাঁড়াবে বা কোনটা থেকে ট্রেন ছেড়ে যাবে সেটা কেউ বলতে পারছেনা ,আবার ডিসপ্লেতেও দেখানো হচ্ছেনা। ১০টা বেজে গেল,ট্রেনের দেখা নেই। অপেক্ষা করতে করতে ১১টা বেজে গেল ,বহু প্রতিক্ষিত ট্রেনের দেখা অবশেষে পেলাম। মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কী ঘোষণা দেয়া হচ্ছে সেটা বুঝতেই পাঁচ মিনিট কেটে যায়। ট্রেন ছাড়ল ১১-৩০ মিনিটে।


ট্রেন নং-৭০৫,কোচ-চ,আসন-২৫,শ্রেণি-শোভন। কোচের গায়ে লেখা আছে ৯২ জন বসিবেন। ট্রেন চলতে শুরু করলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে বিস্মিত হলাম,পুরো কোচে মাত্র ৯ জন যাত্রী।একটু পরেই শুনলাম প্রায় সব কোচেই একই অবস্থা। বিমানবন্দর স্টেশন অতিক্রম করার পর থেকেই উঠতে শুরু করলো বিভিন্ন স্টেশনের লোকাল যাত্রী। যে যেভাবে পারছে উঠছে,যে যেভাবে পারছে বসছে। মুহূর্তেই কোচ ভর্তি হয়ে গেল। এক স্টেশনে যদি ১০ জন নামে তো ১৫ জন ওঠে। এরই মধ্যে উঠতে শুরু করলো হিজড়া,হকার,টোকাই,ভিক্ষুক। বিকলাঙ্গ কিছু ভিক্ষুক এমন ভাবে যাত্রীদের চেপে ধরছে যে বাধ্য হয়ে কিছু দিয়ে পরিত্রাণ পেতে হয়েছে। একটি আন্তঃনগর ট্রেন আর লোকাল ট্রেনের মধ্যে কোন পার্থক্য সেদিন খুঁজে পাইনি।


ঘন্টা দু পরে গেলাম টয়লেটে। হায় খোদা, এ কী অবস্থা ! পানি নেই , পানির কল নেই, বেসিন নেই,এমনকি কোন বদনাও নেই। কোন এ্যাটেনডেন্টকেও কোচে খুঁজে পেলামনা। কোচে ক্রমাগত ভাবে প্রতি তিন মিনিটে একজন হকার চেচিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে। রেলের নিজস্ব ক্যাটারিং সার্ভিসের লোকজন তো আছেই। ফিতা চুড়ি থেকে শুরু করে পোলাও মাংস কোন ব্যবসাই বাদ যায়না ট্রেনে। যেই একটু ঘুম ঘুম ভাব আসছে অমনি কানের কাছে বিকট শব্দে “এই পানি”“এই বাদেম ভাজে”…….। যাত্রা পথে কিছু খাবেন না বলে শপথ করে আসলেও খাবার জিনিস দেখতে দেখতে এক সময় নিজের পেটও চোঁ চোঁ করতে থাকবে। শুরু হলো আর এক বিরক্তি,সেটা হলো যেখানে সেখানেই ট্রেন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আশে পাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি “ক্রসিং”।
ট্রেনে চুরি ছিনতাইয়ের কথা এর আগে শুনেছিলাম কিন্তু সেটা রাতে বেলা হয়ে বলে জেনেছি। তাই বলে দিনের বেলা , সবার চোখের সামনে ট্রেনে ছিনতাই হবে আর সেটা দেখবো এমন কখনও ভাবিনি। আমার পাঁচ আসন পেছনে এক ভদ্রমহিলা বসেছেন(সিঙ্গেল আসনে)। মহিলার হাত ব্যাগটি কোলের উপর রেখে ফিতাটা গলায় জড়িয়ে নিয়েছিলেন। এরপর এমন ভাবে ওড়না পেচিয়ে রেখেছিলেন যে ফিতাটা দেখা যাচ্ছিলনা। মহিলা সম্ভবত কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ করেই ছিনতাইকারী ব্যাগটি ধরে হ্যাচকা টান মারে। অমনি মহিলা গলায় পেচানো ফিতার টানে আসন থেকে ফ্লোরে পড়ে যান। আশে পাশের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মহিলাকে টেনে দরজার কাছ পর্যন্ত নিয়ে যায় ছিনতাইকারী। লোকজন মহিলাকেই আগে ধরে, কারণ মহিলাকে ছেড়ে দিলে ছিনতাইকারী টান মেরে নিচে ফেলে দিত। আর চলন্ত ট্রেন থেকে এভাবে ফেলে দিলে কারো বাঁচা সম্ভব নয় এটা আপনিও জানেন। মহিলার পা টেনে ধরে রেখেছে লোকজন আর গলায় ফিতা পেচানো অবস্থায় ব্যাগ ধরে টানছে ছিনতাইকারী। এ অবস্থায় আর দু মিনিট থাকলে মহিলা গলায় ফাঁস লেগে এমনিতেই মরে যেতেন। শেষে একজন লোক ছিনতাইকারীকে যেই ধরতে গেলেন অমনি ছিনতাইকারী চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ মেরে নেমে গেল। মহিলা বাকী সময়টুকু আর স্বভাবিক হতে পারেননি। সেই ট্রেন সেদিন রাত ১২-৩০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও রোড রেল স্টেশনে এসে পৌঁছে।


একটা ট্রেন বাংলাদেশের সবচে দীর্ঘ রেলপথে এভাবে চলতে পারেনা। দীর্ঘ যাত্রায় সবচে জরুরী যে জিনিসটা তা হলো খাওয়ার ব্যবস্থা এবং টয়লেট। দুটোরই যাচ্ছে তাই অবস্থা। ক্যাটারিং সার্ভিসে সেই গৎবাধা স্যান্ডউইচ,চিকেন ফ্রাই আর বিরিয়ানী। এটাই হলো খাবার। রেলের কর্তাদের বলছি আপনারা কখনও ওই চিকেন ফ্রাইগুলো খেয়ে দেখেছেন ? আপনারা কী জানেন ওসব কদিনের পুরনো থাকে ? দীর্ঘ যাত্রাপথে বিরিয়ানী কজন পছন্দ করে ? আর কি কোন খাবার বানানো শেখেনি ওরা ? টয়লেটগুলোতে দয়া করে একবার নিজেরা ঢুকে দেখুন সেখানে কী অবস্থা বিরাজ করছে। এর আগে আমি তাপানুকুল কোচে ভ্রমণ করেও দেখেছি সে টয়লেটেও পানি পাইনি। আর ঢাকা-পঞ্চগড় রুটের একতা ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনে কারা কোন স্বার্থে অর্ধশত হকার,হিজড়া,ভিক্ষুক,টোকাই ওঠায়। কোথায় থাকে এ্যাটেনডেন্টরা ? কোথায় থাকে রেল পুলিশ ? কেন ট্রেন দুটি অনির্ধারিত স্থানেও আটকিয়ে যাত্রী ওঠা নামা করায় ? কেন টিকিট কাটতে গিয়ে শুনতে হয় “নেই” ,অথচ শুন্য আসন নিয়ে ছুটে চলে ট্রেন ? কোনপ্রকার যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই কেন প্রায়ই সিডিউল বিপর্যয় ঘটে ? আজ নানাবিধ অবব্যবস্থার কারণে আকাঙ্খার ট্রেন দুটি থেকে সাধারণ মানুষ মুখ ফেরাতে শুরু করেছে। তবে কি আমরা ধরে নিতে পারি এসব সেই পরিবহন মাফিয়াদের ষড়যন্ত্রেরই একটা কৌশল, যা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে রেলওয়ের ভেতরে থাকা কেউ ?
আমার লেখা পড়ে দয়া করে কেউ ট্রেনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা ভাববেন না। আমি বরং এজন্যই সত্যগুলো তুলে ধরছি যাতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যাত্রীর সামনে আসা বিভিন্ন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *