শনিবার, জুলাই ২

নাগরিক ভাবনাঃ বিপন্ন ফুটবলে মেয়েদের সাফল্য-অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীন

বাংলাদেশের ফুটবলের এখন “স্বর্ণযুগ(?)”। ঢাকায় কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল ষ্টেডিয়ামে ফেডারেশন কাপে ফুটবল টুর্ণামেন্ট চলছে। পৃথিবীর আর কোন দেশে এ রকম ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এমন তথ্য পাওয়া যায়না। বেলুন ফুলিয়ে রাখা হয়েছিল  কর্তা ব্যক্তিরা আসবেন ছবির পোজ দিবেন , বেলুন উড়ানো যায়নি। জাতি সহ বিশ^বাসী প্রত্যক্ষ করছে উদ্বোধনী খেলায় ৪ দলের খেলা , ২ দল আসেনি। সুতরাং কোন ম্যাচই হয়নি। যাদের জন্য টুর্ণামেন্ট তারাই আসেনি। কর্তৃপক্ষ দৃঢ় মনোভাব পোষণ করেছেন। দল আসুক আর না আসুক টুর্নামেন্ট চলবে। বাফুফের বর্তমান কমিটি দেশের ফুটবলে কফিন ঠুকে দিয়েছে অনেক আগেই তারা আরো পেরেক ঠুকতে চায়। বাফুফের বর্তমান কমিটি সব দিক থেকেই রেকর্ড গড়েছে। তাদের কর্মকান্ড নিয়ে লিখতে আর ইচছা হয়না। কেননা কতো আর লেখা যায়। ছেলেদের ফুটবল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পর্যায়ে রয়েছে। এই নের্তৃত্বের হাতে দেশের ফুটবলের উন্নয়নের দায়িত্ব থাকলে ভবিষ্যতে ফিফার ইতিহাসে লেখা হবে , ফুটবলের বিলুপ্তি শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। আমাদের মেয়েরা ভালো করেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়া বান্ধব মহামান্য রাষ্ট্রপতি , মাননীয় প্রধানমন্ত্রী , মাননীয় স্পিীকার, ক্রীড়া মন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের সাথে দেশে মানুষ উৎসাহিত হয়েছে। আশা করছে মেয়েরা আমাদের মুখ রক্ষা করবে। মেয়েরা কষ্ট করেছে। দেশকে ভালোবেসে মেয়েরা দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। এখন ভাববার বিষয় এই সাফল্য কতদিন ধরে রাখা যাবে ? যে সব দেশ আমাদের সাথে খেলে ঠকেছে তারাতো বসে থাকবেনা। তারা ভুল শুধরে এগিয়ে যাবে। আর আমরা তো হাওয়ায় ভাসবো। উদ্বেলিত হবে মেয়েরা। কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের জাহির করবে নিজেরা এই সাফল্যের কত অংশের দাবীদার তা প্রকাশে অস্থির থাকবে।
সমস্যা অন্য জায়গায়। ছেলেদের খেলার চেয়ে মেয়েদের টীম পরিচালনা করা বেশ কঠিন। এবছর যে মেয়েটি ভালো খেলেছে পরের বছর জানা যাবে মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। খেলাতে মেধারও দরকার হয়। শিক্ষার দরকার হয়। মেয়েদের জন্য এমন জাতীয় প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেখানে পড়াশোনার সাথে খেলা চলবে। না হলে মেয়েদের ফুটবলে শিক্ষিত খেলোয়ার পাওয়া যাবেনা। আর খেলোয়ার ধরতে হবে অল্প বয়সে। তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাবে খুবই গরীব ঘরের মেয়েরা এখন ফুটবল খেলছে যারা অনাদরে অবহেলায়  বড় হয়েছে। তারা অপুষ্টিতে ভুগেছে। তাদের শরীর যা হবার তা হয়েছে। আর তেমন কিছু হবেনা। খেলোয়ার তৈরিতে বাফুফের তেমন কোন কৃতিত্ব নাই। কৃতিত্ব আছে রানীশংকাইলের তাজুল ইসলামের , পীরগঞ্জের কোষারানীগঞ্জের রামদেবপুর হাই স্কুলের বাদশারুলের। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাতদিন পরিশ্রম করে নেশার বসে মেয়েদের নিয়ে মাঠে পড়ে আছেন। তৈরি করা খেলোয়াড়দের খেলা থেকে  বাফুফে বা টুর্ণামেন্ট আয়োজকরা খেলোয়াড় বাছাই করে। বাফুফে কোন দিন খোজ নেওয়ার সময় পায়নি রাঙ্গাটুঙ্গি বা রামদেবপুরের কিভাবে কোন পরিবারের কোন খেলোয়ার খেলে। বিকেএসপি বছরে ১বার জেলা শহরে কয়েক ঘন্টার মাইকিং করে খেলেয়োড় বাছাই করে। বিষয়টা বিশ্লেষন করলে দাঁড়ায় এই রকম যে, খেলোয়াড় শুধু শহরেই জন্মগ্রহণ করে। গ্রামের প্রতিভাবানরা খবরও পায়না।
একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। পীরগঞ্জের কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর হাই স্কুলের মেয়েদের নিয়ে ২০০৮ সালে সিটিসেল জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপের খেলা খেলতে ঢাকা গিয়েছিলাম। জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার কোষারানীগঞ্জের রামদেবপুর হাই স্কুলের ছাত্রী মুনমুন জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের স্ট্রইকার হিসাবে সাফ মহিলা ফুটবলে শ্রীলংকা এবং অনুর্ধ ১৯ ফুটবলে মালয়েশিয়ায় খেলেছে , কোলকাতায় খেলেছে। ঠাকুরগাঁয়ের মেয়েরা এখন বাংলাদেশের ফুটবলে আলোচিত শক্তি। তারা  ২ বার জোনাল চ্যাম্পিয়ন হয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এবং চট্রগ্রাম জহুর আহমদ ষ্টেডিয়ামে খেলে এসেছে। তারা ফেয়ার প্লে ট্রফি অর্জন করেছে। তারা তখন বাংলাদেশের ৫ নং ফুটবল দল। তবে বিষয়টির গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারির শেষে দিনাজপুরে মহিলা ফুটবলের জোনাল চ্যাম্পিয়নশীপ শুরু হয়। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহনের জন্য কয়েক মাস ধরে ঠাকুরগায়ে পত্র যোগাযোগ করেও ফুটবল ফেডারেশন কোন সাড়া পায়নি। জেলায় মহিলা ফুটবল টীম তৈরি করার জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রতিটি জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থাকে ৫০,০০০.০০ টাকা অনুদানও দিয়েছিল। টাকা খরচ হয়েছে তবে ফুটবলার তৈরি হয়নি। অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়েরা সুযোগ পেল তো একেবারে বঙ্গবন্ধু ষ্টেডিয়ামে। উদ্যোগ ব্যক্তিগত হলেও এফিলিয়েটেড সংস্থা হিসাবে  ডি এফ এর নিজশ্ব কোন তহবিল না থাকায় তারা দারস্থ হন জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার নিকট। মহিলা ক্রীড়া সংস্থা অনেক দেন দরবার করে দশ হাজার  টাকা ধার দেয় বটে তবে কেলেংকারীও কম করেনি। চেক দেওয়ার ৫ মিনিটের মাথায় তুলকালাম কান্ড ঘটে যায় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার মিটিংয়ের স্থানে। যদিও সেই চেকটিই তারা ফেরত নিয়েছেন। মহিলা ক্রীড়া সংস্থার করিৎকর্মা গুরুত্বপুর্ন সদস্য ( তারা কবে খেলোযার বা সংগঠক ছিলেন তা গবেষনার বিষয়) সাংবাদিক ডেকে তথ্য সংগ্রহ করে দারুন উত্তেজনার খবর আবিস্কার (?) করেন। জানানো হয় ঠাকুরগায়ের কোন টীম এন্ট্রি না করেও ঠাকুরগাও জেলা মহিলা দলের ফুটবল খেলার নাম করে টাকাটি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরদিন বহুল প্রচারিত ২ টি দৈনিকে ফলাও করে এই প্রতারনার (?) খবর ছাপানো হয়। খবরে বলা হয় কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য খেলোয়াড়ের ছদ্ম বেশে গ্রামের মেয়েদের ঢাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি মহিলা ক্রীড়া সংস্থা ঠাকুরগায়ের মেয়েদের জন্য তাদের জার্সিগুলিও ধার দিয়ে সহায়তা করেনি। খেলতে যাওয়া মেয়েরা  ঢাকাতো তো দুরের কথা অধিকাংশ মেয়ে ঠাকুরগাও শহরই দেখেনি। প্রত্যন্ত  গ্রামের এই মেয়েরা নিঠুর গরীব ঘরের সন্তান।  কেউ কেউ অন্যের জামা ধার করে ঢাকা গিয়েছিল। মেয়েরা ঢাকায় গিয়ে ট্রাফিক জ্যাম আর হাইরাইজ বিল্ডিং দেখে বিষ্ময়াভিভুত। টীমের সাথে কি কি কাগজপত্র নিতে হবে তাও জানা যায়নি।  এদিকে ঢাকা গিয়ে নুতন বিপদে পড়তে হয়েছিল। ঠাকুরগায়ে দশ টাকা দিয়ে যে ছবি তোলা যেত , ঢাকায় সে ছবি তুলতে হয়েছে একশত টাকা মাথাপ্রতি। মেয়েরা যখন  ছবি তোলার জন্য স্টুডিওতে যাচ্ছিলো  সে সময় মেয়েদের চাহনি আর পোষাক আশাক দেখে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা ধারনা করেছিল  মেয়েগুলিকে পাচার করা হচ্ছে। ক্রমাগত অপুষ্টিতে ভোগা গ্রামের এই মেয়েরা ১৩ ঘন্টা জার্নি করে দুপুর রাতে ঢাকা পৌছে। সারা রাস্তা কেউ বমন করছে। সেই মেয়েরা বঙ্গবন্ধু জাতীয় ষ্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচে শক্তিশালী সাতক্ষীরা দলের সাথে ১১ গোলে  পরাজয়ের সংবাদে ঠাকুরগাও মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা দারুন উল্ল¬সিত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। একদিন পর সেই ঠাকুরগায়ের পিচ্চি মেয়েরা হট ফেবারিট ঢাকা জেলাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে বুড়িগঙ্গা অঞ্চলের ঢাকা ভেন্যুতে বিষ্ময় সৃষ্টি করে। যে ঢাকা ফাইনাল রাউন্ডে খেলার স্বপ্ন দেখছিল , প্রাথমিক রাউন্ডেই তা রুখে দিল পীরগঞ্জের জফুরা আর মৌসুমীরা। ঢাকায় ফেডারেশন কর্মকর্তাদের ঘোর কাটতেও সময় লেগেছিল। এই খবর ঠাকুরগাঁও পৌছালে নুতন গবেষণা পত্র তৈরি হলো। টেলিভিশনে খবর প্রচারিত হলে ঠাকুরগায়ের দুর্মুখরা নুতন তথ্য আবিস্কার করে বলতে শুরু করলেন, সেদিন ঠাকুরগায়ের মেয়েরো খেলেনি। টীম ভাড়া করে খেলা হয়েছে। এই রকম অবস্থা সারা দেশেই। এই সমস্যা মোকাবেলা করেই দেশের নারী  ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হবে। ফেডারেশনকে এই বিষয়গুলি মাথায় রাখতে হবে। কাজটা মোটেও সহজ হবেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.