শনিবার, জুলাই ২

শোকাবহ ১৫ আগষ্ট -আবু মহী উদ্দীন সাবেক জেলা ক্রীড়া অফিসার

আগষ্ট মাসটির নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালী হৃদয় যন্ত্রনাদগ্ধ হয়। হৃদয়পটে ভেসে ওঠে, স্বাধীনতার স্থপতি , জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নাম। ১৫ আগষ্টের হত্যাকান্ডে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

১৯২০ সালে যে শিশু ‘খোকা’ , পরে শেখ মুজিবুর রহমান, পাকিস্তানী শাসন শোষণের বিরুদ্ধে ২৪ বছর ধরে গোটা বাঙ্গালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ৬৬ সালে বাঙ্গালী জাতির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা উপস্থাপন করেছিলেন , ৭০ এর নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিলেন , জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন ৭১ এর ৭ মার্চে , বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৬ মার্চে , তাঁর নামেই পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা বিজয়ী হয়েছি।

কৃতজ্ঞ বাংঙ্গালী জাতি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভুষিত করেছে , জাতির জনক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে , বিশ্ববাসী তাঁকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসাবে স্ব^ীকৃতি দিয়েছে।

বাংঙ্গালী জাতির মুক্তির আকাংখায় ১৮ বারে ১৪ বছর জেল খেটেছেন , ২ বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন ।

যিনি বিশ্বাস করতেন কোন বাঙ্গালী তাঁকে আঘাত করতে পারেনা , তিনি শতাব্দির মহানায়ক , বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি চক্রান্ত করে ৭৫ এ প্রতিশোধ নিয়েছে। জাতিকে মেধাশুন্য করতে তারা বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে , জাতিকে নের্তৃত্বশুন্য করতে জাতীয় নেতাদের হত্যা করেছে। মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের শাস্তির বদলে পুরস্কৃত করে শাসকরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে নিজেদের  সম্পৃক্ততা প্রমান করেছে। এমনকী হত্যাকারীদের কোনদিন বিচার করা যাবেনা মর্মে আইন করা করেছিল।  কিন্তু তাদের ব্চিার হয়েছে , রায় আংশিক কার্যকর হয়েছে, জাতির প্রত্যাশা বিদেশের মাটিতে পালিয়ে থাকা কুলাঙ্গারদের ফাঁসি কার্যকর হবে।

মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে যারা ভেবেছিল বাঙ্গালীর সকল চেতনা থেকে তাঁকে মুছে ফেলা যাবে তারা অর্বাচীন। বাঙ্গালী জাতি মুজিবকে ধারন করে চেতনা ও বিশ্বাসে।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমার্থক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশটাকে স্বাধীন করার জন্য।  তিনি সারাটা জীবন একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছেন , এগিয়ে গেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা , বাঙ্গালীর মুক্তির জন্য।  এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে তিনি বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি ও তাঁর পরিবার অসহনীয় দুঃখ কষ্ট -যাতনা ভোগ করেছেন কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত হননি , তিনি আমাদের স্বাধীন করে গেছেন। ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের শেষে স্বাধীনতার ডাক  দিয়েছিলেন ১৯৭১ এর ৭ মার্চের যুগান্তকারী ভাষণে।

বাংঙ্গালী জাতি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে , জাতীয় জনক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে গর্বিত হয়েছে। বিশ্ববাসী তাঁকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তিনি ছিলেন বলে আমরা স্বাধীনতার মতো বড় অর্জন পেয়েছি। স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে নিজ অবস্থান তৈরি করেছে। তাঁকে সামনে রেখে পথচলা। দুঃখী মানুষের  জীবন বদলানোর জন্য তাঁর অন্তহীন প্রেরনায় আজকের বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশের সংস্কৃতির বাইরের  কথা যদি বলি , আমি নেলসন মেন্ডেলার কথা বলব। এই বিশ্ব নেতা ২৭ বছর জেল খেটেছেন। নির্যাতিত  মানুষের পক্ষে কাজ করেছেন। তাদের মুক্তি আন্দোলনে নের্তৃত্ব দিয়ে সফল হয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি তরুনদের সামনে এক অজেয় মানুষ। তেমনি কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো নিজের দেশকে সা¤্রাজ্যবাদী  রাষ্ট্রের বলয় থেকে বের করার জন্য বিপ্লবীর ভুমিকায় সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন।

১৯৫২ সালের ভ্ষাা আন্দোলনের সময় মুজিব জেলে অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। মুজিবের দৃঢ়তার কাছে নতি স্বীকার করে শেষে সরকার  তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিব লড়েছেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য। তাই তাঁকে জীবনের অনেকটা সময় কাটাতে হয়েছে কারাগারে।  বঙ্গবন্ধু কখনোই নিজের প্রানের ভয়ে ভীত ছিলেননা। তাঁকে হত্যা করার জন্য বার বার সব আয়োজন সম্পন্ন করেও পাকিস্তানীরা তাঁকে মারতে পারেনি। আগরতলা মামলায় তাঁর  মুত্যুদন্ড হয়েছিল, বাংলার মানুষ তাঁকে মুক্ত করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তাঁর মৃত্যুদন্ড হয়েছিল , সেই মৃত্যুদন্ড সেদিন কার্যকর হয়নি। হয়েছে আরো ৪ বছর পরে ।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙ্গালীদের বিশ্বাস করতেন নিজের চেয়েও বেশী। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেননা। তাঁকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব ছিল , যে কোনো বাঙ্গালী তাঁকে আঘাত করতে পারে। সেই ভালোবাসা এবং বিশ্বাসই তাঁর মৃত্যুর কারন হয়েছিল। সেই স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ,  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তাঁকে হত্যা করেছে যারা , তাদের ভাষা ছিল বাংলা , তাদের হাতে ছিল গরিব বাঙ্গালীর রক্ত পানি করা টাকায় কেনা অস্ত্র। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, শুধু বেগম মুজিব নন , শিশুপুত্র রাসেল , গর্ভবতী পুত্রবধু ও রেহাই পায়নি সেই হত্যকান্ড থেকে।

আগষ্টকে ঘাতকরা তাদের নিষ্ঠুর টার্গেটের মাস হিসাবে বেছে নিয়েছে বার বার। ১৯৭৫ সালের এ মাসে যেমন বাঙ্গালী হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী শতাব্দীর মহানায়ককে , তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছিল জাতীর জনকের কন্যা  ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সৃষ্টিকর্তাই তাকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু রক্ষা করা যায়নি সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মীনি নারী নেত্রী আইভি রহমানকে। ১৫ আগষ্টের ভয়াল কালো রাত্রি শুধু ইতিহাসের স্বাক্ষী নয় ,এই রাত মহাকালেরও স্বাক্ষী হয়ে থাকবে সারা জীবন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বিশ্ব নের্তৃবৃন্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বৃটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হ্যারাল্ড উইলসন লিখেছিলেন ‘ এটি অবশ্যই  একটি সর্বোচ্য জাতীয় ট্রাজেডি , আমার কাছে এটি বিশাল মাত্রার ব্যক্তিগত ট্রাজেডি।

বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত হওয়ার পর কিউবার নেতা   ফিদেল কাস্ত্রোর সারা জাগানো মন্তব্যটি  মুজিবের বিশালতার স্বúক্ষে সমোচ্চারিত একটি প্রতিচ্ছবি , আমি হিমালয় দেখনি , তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি।  ব্যক্তিত¦ এবং সাহসে এই মানুষ হিমালয়ের মতো এই মন্তব্যই  করেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। বঙ্গবন্ধুকে বাঙ্গালীদের নায়ক হিসাবে আখ্যায়িত করে বিশিষ্ট মিশরীয় সাংবাদিক হাসনাইন হাইকাল বলেছেন ‘শেখ মুজিবর রহমান একমাত্র বাংলাদেশের নয়। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর  কাছে স্বাধীনতার আশ্রয়দাতা’। তিনি বলেন ‘তাঁর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ হলো বাঙ্গালী সভ্যতা ও সংস্কৃতির নুতন উত্থান। ‘মুজিব অতীতে এবং বর্তমান সময়ে বাঙ্গালীর নায়ক  এই মন্তব্য করেন ‘দ্যা আল আহরামের’ প্রাক্তন সম্পাদক এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দুল নাসেরের ঘনিষ্ঠ সহযোগি।

বিখ্যাত বৃটিশ সাংবাদিক  স্যার র্মাক টালি যিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকটি জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন , তিনি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধুর একটি দুর্দান্ত আওয়াজ ছিল যা জনতার প্রশংসা করতে পারে এবং তাদেরকে একত্রিত করতে পারে।  তিনি একজন ক্যারিশমেটিক লিডার।

লন্ডন অবজারভারের আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক সিরিল ডান এক নিবন্ধে বলেছেন  বাংলাদেশের হাজার বছরের মধ্যে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা যিনি রক্ত, বর্ণ ,ভাষা ,সংস্কৃতি এবং জন্মের দিক থেকে ছিলেন একজন পুর্ণাঙ্গ বাঙ্গালী। এক অর্থে  শেখ মুজিব জর্জ ওয়াশিংটন মহাত্মা গান্ধী , ডি ভ্যালেরার চেয়ে মহান নেতা এই ভাবেই মন্তব্য করেছিলেন বৃটিশ মানবতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রয়াত লর্ড ফেনার ব্রোকওয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.