সোমবার, এপ্রিল ১২

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় উৎপাদনশীলতা ও আমাদো বিবেচ্য বিষয় -অ্যাডভোকেট আবু মহী উদীন

শিল্প , কৃষি ও সেবা খাত সহ সকল ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ২ অক্টোবর জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত হচ্ছে। চলতি বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় উৎপাদনশীলতা ’
উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতাকে এক করে দেখার সুযোগ নাই। উৎপাদনশীলতার সাথে সাথে কয়েকটি শর্ত জড়িত। যেমন যে হারে পণ্য এবং সেবাসমুহ তৈরি করা হয় সেটাই উৎপাদনশীলতা , আবার একজন ব্যক্তি , যন্ত্র কারখানা , ব্যবস্থাপনা প্রভৃতির যোগান বা উপকরণ সমুহকে প্রয়োজনীয় উৎপাদনে পরিণত করার দক্ষতার একটি পরিমাপকে ৩য়ত: যে হারে একটি কোম্পানী বা দেশ পণ্যসমুহ তৈরি করে , সাধারণত: এটা কত সংখ্যক মানুষ বা কি পরিমান উপকরণ পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত আছে তা দ্বারা বিবেচিত হয়।
প্রতি বছরই উৎপাদনশীলতা দিবসে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়ে থাকেন। উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়ন ও বিকাশ নিশ্চিতকরণের উপর জোর দিয়ে, রাষ্ট্রপতি বলেছেন, উৎপাদনশীলতা জাতীয় অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমতে ত্বরান্বিত করে এবং উৎপাদন , সঞ্চয় , বিনিয়োগ , এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। একটি দেশ যখন তার জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে , দেশের নাগরিকরা সুশিক্ষিত হবে , সামাজিক সুরক্ষা বাড়বে এবং ন্যায়সঙ্গত আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে , তখন সে দেশ সুখী ও সমৃদ্ধ হবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। আমরা ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপটি হচ্ছে ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়ন এবং একটি উন্নত দেশে পরিনত হওয়া। একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধ পরিকর। সরকারের এই দীর্ঘ মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরী। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক কর্মক্ষমতা এবং বাংলাদেশের সামাজিক সুচকগুলিতে পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতির, রাজনৈতিক ও ব্যবস্যায়ী সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার দাবী করেছেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী।
বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সকল ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা উন্নত করা অনিবার্য , প্রতি বছর জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস অনুষ্ঠিত হলেও জনগণের মধ্যে উৎপাদনশীলতার ধারণা স্পষ্ট করা এবং উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরী। বিষয়টি সম্পর্কে উৎপাদক , শিল্প মালিক বা সেবা দানকারী সংস্থাগুলি এতদসম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা লাভ করলে এবং তাদের করণীয় নির্ধারণ করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীলতার প্রবনতা ত্বরান্বিত করার জন্য গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করবে। জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসে বাংলাদেশ টেলিভিশন ,নাটক , টকশো প্রচার করে এবং সংবাদপত্রগুলি দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ ক্রোড় পত্র প্রচার করে থাকে। মোবাইল কোম্পানীগুলি দিনটিতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে এসএমএস এবং ভয়েস মেইল প্রেরণ করে থাকে। বিষয়টি ঐ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। সামগ্রিকভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উপলক্ষে কেবল মাত্র আলোচনা আর র‌্যালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যারা এর বেনিফিসিয়ারি হবে তাদের সম্পৃক্ত করা দরকার। যেমন শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শিল্পপতিদের জন্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে , সে ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা বা আমদানী রপ্তানীর ক্ষেত্রে বাধা সমুহ দুর করা , শিল্প স্থাপনের জন্য জায়গা দেওয়া , পুঁজির ব্যবস্থা করা এসব করতে হবে সরকারকে। এক কথায় ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ সহ প্রতিযোগিতামুলক বাজারে টিকতে হলে আধুনিক সহায়তা প্রয়োজন। আবার কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকরা বিপদে পড়েছে। কুৃষি উৎপাদনের খরচ কমানোর জন্য সুযোগ সুবিধা কৃষক পর্যায়ে পৌছিয়ে দিতে হবে। কাগজে কলমে হয়তো সরকারের অনেক সুবিধার কথা বলা আছে কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে তার কতটুকু কৃষক পর্যায়ে সহাযক হয়েছে সেটাও মূল্যায়ন জরুরী। যেমন বর্তমান সময়ে ধান কাটার মৌসুমে ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায়না। শ্রমিক সমস্যার কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় সে ক্ষেত্রে হারভেষ্টিং মেসিন গ্রাম প্রতি ১ টা করে সরকারের তরফ থেকে বা সমবায় ভিত্তিতে বা ব্যাংকের মাধম্যে দিলে বিঘাপ্রতি লেবার খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে এবং সময় কম লাগবে। সেই সময়ে অন্য ফসলের জন্য জমি তৈরি করা যাবে।
২০১৬ সালে শিল্প ইউনিটসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে “উৎপাদনশীলতা সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়” এই প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে দেশে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালন করা হয়। শিল্প মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন উৎপাদনশীলতা সংস্থা (এনপিও) এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি সহ দিবসটি উপলক্ষ্যে বিস্তৃত কর্মসুচি পালন করেছে। এই বছরেও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উৎপাদনশীলতার ধারনাটি জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।
জনগণ এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসাবে গড়ে তুলেেত সহায়তা করে , রিপোর্ট এজেন্সিগুলির। শিল্প, কৃষি ও সেবা খাত সহ সকল ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সেবারে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত হয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উদযাপিত হয়েছে। সেই সব প্রতিপাদ্য বিষয় গুলোর মূল বক্তব্য হলো ‘টেকসই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি , সমৃদ্ধশালী দেশের জন্য উৎপাদনশীলতার বিকাশ’
বিবেচনা করে দেখলে দেখা যাবে প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি খুবই যুগোপযোগি। কিন্তু কার্যকারীতা বিবেচনায় নিয়ে দেখা যাবে উৎপাদনশীলতার মূখ্য বিষয় হলো উৎপাদন খরচ কমানো । কিন্তু আমাদের বাজার ও বিপনন ব্যবস্থায় ঠিক তার উল্টা। পর্যায়ক্রমিকভাবে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য বা সেবার দাম বাড়িয়ে কর্তৃপক্ষ খরচ তুলে নিতে পারছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের পক্ষে কোনভাবেই তাদের কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ তুলে আনার কোন সুযোগ নাই। কৃষি ব্যবস্থায় ৩য় পক্ষের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে কৃষককুল উৎপাদন বৃদ্ধি করেই দিশেহারা। প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের দাম পায়না কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা বিনা শ্রমে লাভবান হয়। সরকার কখনো কখনো কৃষি পণ্যের দাম বাড়ায় কৃষকদের কল্যানের বিষয় বিবেচনা করে , কিন্তু কৃষিপন্য তখন আর কৃষকদের হাতে থাকেনা। এই অবস্থাটি মোটেও ভাল বা গ্রহণযোগ্য নয়। কৃষি নির্ভর দেশে কৃষি উৎপাদকরা উৎপাদন বিমুখ হলে সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে যেতে হবে। সুখের কথা ধান ক্রয়ের বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রী মন্ত্রনালয় কর্মকর্তাদের কার্যকরী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। শুধু দেখার বিষয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভর করে খাদ্য মন্ত্রীর এই ভাল উদ্যোগটা ভেস্তে দেয় কিনা।
২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে আমরা প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। এই পরিপেক্ষিতে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে সময়োপযোগি পরিকল্পনা প্রনয়ন করে , সম্পদের অপব্যবহার বন্ধ করে এবং বর্তমান জনশক্তি , মেশিনারিজ এবং আধুনিক উৎপাদন সামগ্রীর যথাযথ ব্যব্হার করে উৎপাদনশীলতা সর্বোত্তম পর্যায়ে উন্নীত করা যেতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নুতন মিল ও কারখানা স্থাপন করা ছাড়াও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং নুতন প্রযুক্তি আদান প্রদানের মাধমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের সময় বন্ধ হওয়া অনেক মিল কলকারখানা আবার চালু করা হয়েছে। সরকার দেশের শিল্প খাতকে সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন কর্মসুচি বাস্তবায়ন করছে।
প্রতিবছর ২ অক্টোবর যুগোপযোগি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। প্রতি বছরই মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসে মুল্যবান বাণী দিয়ে থাকেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শিল্প মন্ত্রনালয় এসব আশাবাদকে নির্দেশনা বিবেচনায় সারাবছর তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রতি বছরের জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে , শিল্প মন্ত্রনালয় পর্যায়ক্রমিক ভাবে ভিসন ২০২১ , এসডিজি ২০৩০ , এবং ভিসন ২০৪১ অর্জনের লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *